কর্মক্ষেত্রে চাই মানসিক সুস্বাস্থ্য
মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং উন্নত মানসিক স্বাস্থ্য গঠনের প্র্রচেষ্টার সার্বিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতি বছর এ দিনটি পালন করা হয়।
জীবনের প্রয়োজনে হোক বা জীবিকার প্রয়োজনেই হোক প্রতিটি মানুষকে কিছু না কিছু কাজ করতেই হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের দিনের অধিকাংশ সময়ই কর্মক্ষেত্রে ব্যয় হয়।
তাই মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কর্মক্ষেত্রের তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব প্রতীয়মান, যা কোনো প্রতিষ্ঠানের বা দেশের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যেও চূড়ান্ত অবদান রাখে। এছাড়া কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা আমাদের সামগ্রিক সুশৃঙ্খলতার অন্যতম নির্ধারক।
কোনো প্রতিষ্ঠানের নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ বা পরিচালকবৃন্দ যারা কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য উন্নীত করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন তারা শুধু মানসিক রোগের কর্মীদের স্বাস্থ্য রক্ষার্থে সহায়তা করেন না বরং কর্মক্ষেত্রে তাদের উৎপাদনশীলতার দিকেও মনোযোগী হন।
অপরদিকে, নেতিবাচক কাজের পরিবেশ কর্মীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, মাদকদ্রব্য ও অ্যালকোহলের অপব্যবহার, কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, উৎপাদনশীলতা হ্রাস ইত্যাদির দিকে ঠেলে দেয়।
কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ উপাদানগুলোর মাঝে রয়েছে অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যনীতি এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা, দুর্বল যোগাযোগ এবং ব্যবস্থাপনার চর্চা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সীমিত অংশগ্রহণের সুযোগ, অপর্যাপ্ত বেতন কাঠামো অনমনীয় কাজের সময়, পদোন্নতি না হওয়া, কর্মীদের প্রতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আচরণ ও মনোভাব, সহকর্মীদের সহমর্মিতার অভাব, কর্ম সম্পাদনে অস্পষ্ট সাংগঠনিক উদ্দেশ্য, রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি ও দলীয়করণ, স্ব-স্ব কর্মক্ষেত্রে কম নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি। ঝুঁকিগুলো কাজের সামগ্রী সম্পর্কিতও হতে পারে।
যেমন- ব্যক্তির দক্ষতার চেয়ে কাজের মান উচ্চ হলে বা অত্যধিক কাজের চাপ থাকলে তা মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। কিছু কাজ কর্মীর জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ যেমন- অগ্নিনির্বাপক কর্মী, ডুবুরি এদের কাজ। যেসব কাজের ক্ষেত্রে দলীয় সংহতি এবং সামাজিক সমর্থনের অভাব থাকে সেগুলোও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কর্মক্ষেত্রে মনস্তাত্ত্বিক হয়রানি, ঝুঁকিগুলোর মাঝে অন্যতম।
মানসিক রোগের মাঝে সচরাচর বেশি পরিলক্ষিত হয় বিষণ্ণতা এবং উদ্বেগজনিত রোগ; যা কর্মস্থলের বিভিন্ন সমস্যা থেকে উদ্ভূত এবং কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলে। বিশ্বব্যাপী ৩০০ মিলিয়নের বেশি মানুষ বিষণ্ণতায় ভোগে, যা কর্মপ্রতিবন্ধকতার প্রধান কারণ।
২৬০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ উদ্বেগজনিত রোগে ভুগছেন। অনেকেই আবার বিষণ্ণতা এবং উদ্বেগ দুটির সঙ্গেই বসবাস করছেন।
ডব্লিউএইচও-এর নেতৃত্বাধীন একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে প্রতি বছর বিষণ্ণতা এবং উদ্বেগরোগ বিশ্ব অর্থনীতিতে ১ ট্রিলিয়ন ইউএস ডলারের মতো উৎপাদন হ্রাস করছে।
তাছাড়া কোনো ব্যক্তি যদি মানসিক চাপে থাকে তা হলে তার মানসিক রোগের প্রকোপ বেড়ে যেতে পারে অথবা নতুন করে মানসিক রোগ দেখা দিতে পারে যা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত।
দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ মনোযোগে সমস্যা, ঘুমের সমস্যা, স্মরণশক্তি হ্রাস, ইত্যাদি মানসিক সমস্যার পাশাপাশি কিছু গুরুতর শারীরিক রোগ যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
একটি সুস্থ, স্বাস্থ্যকর, কর্মীবান্ধব কর্মস্থল নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে আইন প্রণয়ন, নীতিনির্ধারণ ও বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন জরুরি। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের একটি সাম্প্রতিক নির্দেশিকা অনুযায়ী তিনটি ধাপে এ কাজগুলো করতে হবে। ১. কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত মানসিক রোগের ঝুঁকির কারণগুলো শনাক্তকরণ। ২. কর্মীদের শক্তি বৃদ্ধিকরণ। ৩. কাজের ইতিবাচক দিকের উন্নয়ন সাধন।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক (সাইকিয়াট্রি), ওএসডি-ডিজিএইচএস
সংযুক্ত : জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল

Post a Comment